দেশটিতে খেলাধুলা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারটিও দ্রুত সম্প্রসারণ হয়। গত পাঁচ বছরে চীনের ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট পোশাক ও সরঞ্জামের বাজার ৫১ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু এ প্রবৃদ্ধির সুফল নিতে পারেনি নাইকি। উল্টো কোম্পানিটির বিক্রি টানা আট প্রান্তিক ধরে কমছে।
কোম্পানির প্রতিবেদন বলছে, চীনে ২০২১ সালের তুলনায় নাইকির ব্যবসা প্রায় ৩০ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। মে মাস শেষে বার্ষিক আয় নেমে এসেছে গত আট বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
একসময় চীন ছিল নাইকির সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল বাজার। উচ্চ মুনাফার কারণে অঞ্চলটি কোম্পানির অন্যতম শক্তিশালী ব্যবসা হিসেবে দেখা হতো। এখন সেটিই নাইকির সবচেয়ে ছোট বাজারে পরিণত হয়েছে। ফলে বৈশ্বিকভাবে কোম্পানির ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনাও চাপের মুখে পড়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, চীনে নাইকির সংকট শুধু সাময়িক নয়। দেশটির তরুণ ক্রেতাদের পছন্দ বদলে গেছে। তারা এখন বিদেশী ব্র্যান্ডের পরিবর্তে স্থানীয় ব্র্যান্ডকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। একই সঙ্গে চীনারা এমন পণ্য চান, যা বিশেষভাবে নিজেদের বাজারের জন্য তৈরি। বিশ্বজুড়ে একই নকশার পণ্য বিক্রির পুরনো কৌশল এখন আর আগের মতো কার্যকর হচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ভোক্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যাপারচার চায়নার প্রতিষ্ঠাতা ইয়ালিং জিয়াং বলেন, ‘অনেক তরুণের কাছেই নাইকি এখন আগের মতো আকর্ষণীয় নয়।
ব্র্যান্ডটির পণ্যে নতুনত্বের অভাব রয়েছে। অন্যদিকে অ্যাডিডাসের নতুন নকশা বা স্থানীয় সংস্কৃতিনির্ভর প্রচারণা নিয়ে তরুণদের মধ্যে আলোচনা দেখা যায়।’
চীনে নাইকির নতুন প্রধান ক্যাথি স্পার্কস অবশ্য বলেন, ‘কোম্পানি পরিস্থিতি বুঝে নতুন পরিকল্পনা নিয়েছে। তবে চীনা ক্রেতাদের চাহিদা বদলে গেছে। তারা পণ্যের পাশাপাশি ব্র্যান্ডের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সংযোগও খোঁজেন। তাই চীনের জন্য আলাদা নকশা ও বৈশিষ্ট্যের জুতা ও পোশাক তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বিক্রি বাড়বে বলে আশা করছে কোম্পানি।’
‘চায়না চিক’ বদলে দিয়েছে বাজার
নাইকি চীনে দ্রুত ব্যবসা সম্প্রসারণ শুরু করে ২০০০ সালের দিকে। ওই সময় বিদেশী ব্র্যান্ড ব্যবহারকে অনেকেই মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখতেন। ২০২১ অর্থবছরে চীনে নাইকির বার্ষিক আয় সর্বোচ্চ ৮২৯ কোটি ডলারে পৌঁছায়।
এর পরই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ২০২১ সালে জিনজিয়াং অঞ্চলে জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ নিয়ে নাইকির পুরনো একটি বিবৃতি ফের আলোচনায় আসে। এরপর চীনে ব্র্যান্ডটির বিরুদ্ধে বয়কটের ডাক ওঠে। সামাজিক মাধ্যমে কেউ কেউ নাইকির জুতা পুড়িয়ে প্রতিবাদও জানান। জনপ্রিয় অভিনেতা ওয়াং ইবো নাইকির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেন। একই সময় দেশীয় ব্র্যান্ড আন্টার তুলা ব্যবহারের প্রচারণা জোরদার করে।
এ ঘটনাকে ঘিরে ফের শক্তিশালী হয় ‘গুওছাও’ বা ‘চায়না চিক’ আন্দোলন। এর লক্ষ্য ছিল চীনে তৈরি ও চীনা নকশার পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ানো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত দুই দশকে চীনের স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলো উৎপাদন, প্রযুক্তি, বিপণন ও পণ্যের মানে অনেক অগ্রগতি করেছে। অন্যদিকে ক্রেতারাও এখন বেশি সচেতন। তারা শুধু ব্র্যান্ডের নাম নয়, পণ্যের প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও মূল্যমানকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
প্রতিদ্বন্দ্বীরা এগোলেও পিছিয়ে নাইকি
চীনের বাজারে সব বিদেশী ব্র্যান্ড সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। লুলুলেমন ২০২৫ অর্থবছরে চীনে বিক্রি ২০ শতাংশ বাড়িয়েছে। একই সময় অ্যাডিডাসের আঞ্চলিক আয় বেড়েছে ১৩ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, অ্যাডিডাস চীনের বাজারের জন্য স্থানীয় দলকে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগটা বেশি দিয়েছে। অন্যদিকে নাইকির ক্ষেত্রে বেশির ভাগ নকশা ও পণ্যের সিদ্ধান্ত এখনো বৈশ্বিক কার্যালয় থেকে আসে। ফলে স্থানীয় বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত নতুন পণ্য আনা কঠিন হয়ে পড়ে।
চীনের বাজারে আগের অবস্থানে ফিরতে এখন স্থানীয় পণ্য, বিপণন ও সহজতর বিক্রয় ব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছে নাইকি। তবে চীনা ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে বাড়তে থাকা প্রতিযোগিতার মধ্যে এ কৌশল কতটা সফল হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সিএনবিসি অবলম্বনে